জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি (ফার্সি: جلالالدین محمد رومی; ৩০ সেপ্টেম্বর ১২০৭ – ১৭ ডিসেম্বর ১২৭৩), সাধারণত "রুমি" নামে পরিচিত, ছিলেন ১৩শ শতাব্দীর একজন ফার্সি কবি, সুফি সাধক, ধর্মতাত্ত্বিক, এবং আধ্যাত্মিক চিন্তাবিদ। তিনি মূলত ফার্সি ভাষায় কবিতা লিখলেও তার আধ্যাত্মিক দর্শন ও লেখা পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সুপ্রভাব বিস্তার করেছে। রুমি কেবল মুসলিম বিশ্বে নয়, বরং সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে সুফি মতবাদ ও আধ্যাত্মিকতার এক প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
জীবনী ও প্রাথমিক জীবন:
রুমি ১২০৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বর্তমান আফগানিস্তানের বালখ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা বাহাউদ্দিন ওয়ালাদ ছিলেন একজন ধর্মীয় পণ্ডিত এবং সুফি সাধক। ১২১৫ থেকে ১২২০ সালের মধ্যে, যখন মঙ্গোলরা মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা চালায়, তখন রুমি ও তার পরিবার বালখ ত্যাগ করে এবং বিভিন্ন শহরে ভ্রমণ করতে থাকেন। পরবর্তীতে তারা আনাতোলিয়ার (বর্তমান তুরস্ক) কোনিয়া শহরে স্থায়ী হন, যা তখনকার সেলজুক সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। এখানেই রুমি জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত বসবাস করেন এবং তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো রচিত হয়।
শিক্ষাজীবন ও সুফি দর্শন:
রুমির প্রাথমিক শিক্ষা তার বাবার কাছ থেকে শুরু হয়েছিল, এবং পরবর্তীতে তিনি অন্যান্য বিশিষ্ট শিক্ষকদের কাছেও শিক্ষা গ্রহণ করেন। কোনিয়ায় বসবাসকালে, তিনি শামস তাবরিজ নামের একজন সুফি সাধকের সংস্পর্শে আসেন, যার প্রভাব তার জীবনে এবং সাহিত্যকর্মে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। শামস তাবরিজের সঙ্গে তার সম্পর্কই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের কারণ। শামসের সঙ্গে তার আধ্যাত্মিক সংযোগ তাকে গভীরতর আধ্যাত্মিকতার পথে পরিচালিত করে, যা তার কবিতায় ফুটে উঠেছে।
সাহিত্য ও রচনাবলী:
রুমির সাহিত্যকর্মগুলো ফার্সি ভাষায় রচিত, তবে তা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তার প্রধান রচনাগুলো হলো:
- মাসনভি (মসনভি-ই মাআনভি): রুমির সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ, যা ছয় খণ্ডে বিভক্ত এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞান, সুফি দর্শন, এবং মানবতার প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রকাশ।
- দিবান-ই শামস-ই তাবরিজ: এটি শামস তাবরিজকে উৎসর্গ করা কাব্যসংগ্রহ, যেখানে শামসের প্রতি রুমির গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার পরিচয় পাওয়া যায়।
- ফিহি মা ফিহি: এটি রুমির বক্তৃতা ও আলোচনা সংকলন, যেখানে তিনি আধ্যাত্মিক এবং দার্শনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।
রুমির আধ্যাত্মিক দর্শন:
রুমির আধ্যাত্মিকতা মূলত ভালোবাসা ও ঈশ্বরের প্রতি গভীর অনুরাগের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে মানুষের সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ক প্রেম এবং প্রেমের গভীরতায় নিহিত। তার সুফি দর্শনে প্রেম ছিল সর্বোচ্চ শক্তি, যা মানুষের অন্তর্গত এবং ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিত হওয়ার একমাত্র পথ। তার লেখা কেবল ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক ছিল না, বরং মানবতার সার্বজনীন সত্য ও ভালোবাসার শক্তির প্রতিফলন।
রুমির মতে, পৃথিবীর সবকিছুই ঈশ্বরের এক প্রকাশ। মানুষের আত্মা ঈশ্বরের এক কণা, যা দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত হয়ে ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিত হওয়ার পথে এগিয়ে চলে। তিনি বারবার উল্লেখ করেছেন যে মানুষের আত্মার মূল লক্ষ্য হলো ঈশ্বরের সঙ্গে এক হওয়া এবং প্রেমের মাধ্যমে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা।
প্রভাব ও উত্তরাধিকার:
রুমির প্রভাব তার জীবদ্দশাতেই সীমানা পেরিয়ে গিয়েছিল। মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, ইরান, এবং তুরস্কে তার কবিতা ও সুফি দর্শন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তার মৃত্যু পরেও তার দর্শন ও লেখা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রশংসা অর্জন করে এবং বহু সুফি তরিকার অনুপ্রেরণায় পরিণত হয়। আজও তার কবিতা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয় এবং মানুষ তাকে মানবতার প্রেমের প্রতীক হিসেবে শ্রদ্ধা জানায়।
মৃত্যু:
রুমি ১৭ ডিসেম্বর ১২৭৩ সালে কোনিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু দিবসকে তার ভক্তরা "শেব-ই-আরুস" বা "বিবাহের রাত" নামে স্মরণ করে, কারণ তারা বিশ্বাস করে যে এটি ছিল ঈশ্বরের সঙ্গে রুমির মিলনের রাত। তার মাজার তুরস্কের কোনিয়া শহরে অবস্থিত, যেখানে প্রতি বছর হাজারো মানুষ তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সমবেত হয়।